দিল্লী বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রেখে ‘হয়রানির’ প্রতিবাদ হিসেবে ভারতে প্রবেশ না করে দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
ভারত এ ঘটনায় সতর্ক হবে, তবে ঘটনাটি দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না বলেও জানিয়েছেন উপদেষ্টা।
গত রোববার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয়। তিনি ভারত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট আইওআরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। শুরুতে ভারতে প্রবেশের অনুমতিও দেওয়া হয়নি। উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়টি অন্তত দুই দিন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় ফিরে আসেন।
দিল্লি বিমানবন্দরে ঘটনার বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উপদেষ্টা বলেন, পত্র-পত্রিকায় যা যা দেখছেন, নানা সূত্র থেকে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মিডিয়াতে যা যা এসেছে, আসলে ঘটনাগুলো ঠিক এই রকমই ঘটেছে। আমি আমার জায়গা থেকে খুব অল্প একটা কথা বলি। আমি সেখানে একটা ব্যক্তি হিসেবে যাইনি। আমি এই সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছি, এই রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছি। ফলে আমার সঙ্গে সেখানে যা হয়েছে, আমার কাছে মনে হলো যে আমাদের ইনস্ট্যান্ট একটা প্রতিবাদ করা দরকার। সেই কারণেই আমি আসলে ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি বলেন, যদিও আপনারা মিডিয়াতে দেখেছেন, একটা পর্যায়ে তারা খুবই চেষ্টা করেছেন আমি যেন ভারতে প্রবেশ করি এবং আমার যে নিয়মিত যে কার্যক্রম, সেটায় অংশগ্রহণ করি। কিন্তু আমি সেটা আর করিনি। কারণ আমার মনে হয়েছে, আবারও বলছি, এটা আমি ব্যক্তি হিসেবে মনে করেছি তা না, আমি মনে করেছি এই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা হিসেবে, তখন আমার মনে হয়েছে এই রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে একটা সিগনেচার থাকা দরকার।
আমার কখনো এই উদ্দেশ্য নেই যে এটার মাধ্যমে পাল্টা-পাল্টি কোনো নেগেটিভ পরিস্থিতি তৈরি হোক। আমার মনে হয়েছে একটা মেসেজ এই দেশ ও এই দেশের বাইরে সবার কাছে যাওয়া দরকার, সেটা হচ্ছে এটা শেখ হাসিনার সরকার না। এটা জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত একটা সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারকে দেশের ভেতরে ও বাইরে সব জায়গায়, সেটা মাথায় রেখেই চলতে হয়। একই সঙ্গে অন্যদেরও সেই জিনিসটা কগনিজেন্সে নিতে হয়।
সেই কারণেই আসলে কাজটা করা। এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত না শুধু, অন্য যে কোনো দেশের সঙ্গে ভবিষ্যতে যে কোনো এনগেজমেন্টে আমরা আমাদের একটা সুস্পষ্ট নীতি আছে। কোনোভাবেই আমরা চাই না কোনো দেশের সঙ্গে খুব খারাপ কোনো পরিস্থিতি হোক, কোনো শত্রুতা তো দূরেই থাকুক।
জাহেদ উর রহমান বলেন, কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে, আমাদের স্লোগানের মধ্যে আছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। মানে আমরা বাংলাদেশকে রাখব, তার মাধ্যমে প্রত্যেকটা দেশের সঙ্গে আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এনগেজমেন্ট হবে। এবং সেটা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে বা আমার ক্ষতি করে কাউকে কোনো সুবিধা দেওয়া, এই নীতিতে এই সরকার কোনো দেশের সাথে, আমি আবারও বলছি এটা শুধু ইন্ডিয়া না, কোনো দেশের সাথে এই সরকার যাবে না।
এ ঘটনা দু-দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করবে কি না- এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা চাপ তৈরি করা কোনোভাবেই উচিত না। আমাকে যদি বলেন, আমি অলরেডি বলেছি যে এখানে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটার একটা ইনস্ট্যান্ট রিঅ্যাকশন হিসেবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, সরকারের পক্ষ থেকে আমি এ পদক্ষেপ নিয়েছি। এটা আমি মনে করি আমাদের জায়গা থেকে এর পরবর্তীতে যা যা হচ্ছে, এখন আমরা আর কি করব না করব, সেই ব্যাপারে আমি আসলে বলব না, বলছি না। কারণ এটা আপনারা অলরেডি দেখেছেন আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এটা চলে গেছে।
‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যা যা করণীয় করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, আপনারা দেখেছেন হাইকমিশনের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করছেন। এটা তারা আসলে বলবেন, এই সরকার কতটা প্রতিক্রিয়া দেখাবে। কিন্তু আমি এক্সপেক্ট করব, এই ঘটনার প্রভাব দুই দেশের ভবিষ্যতের এনগেজমেন্টের জন্য, আমি এনগেজমেন্ট কথাটা বলছি, এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এনগেজমেন্ট ইজ ইম্পর্ট্যান্ট, এনগেজমেন্টের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে না।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, দুই ঘণ্টার মাথায় আমি ডিসাইড করেছি ইটস টু মাচ আমি আসলে আর থাকবো না। সময়টাও যে আমি এই রাষ্ট্রের, আমি আবারও বলছি আমি ব্যক্তি না, আমি রাষ্ট্রের একটা পদে আছি সেই পদের প্রতি যে সৌজন্য সেটার অভাব রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে, সে কারণেই আমি এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।
তিনি বলেন, এরপর আমার পাসপোর্ট ফেরত চাইলাম। আর যখন আমি পাসপোর্ট ফেরত চাইলাম, তখন তাদের দিক থেকে খুবই আন্তরিকতা পূর্ণভাবে আমাকে রিকোয়েস্ট করেছেন।
বলা হচ্ছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট না নেওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে- এ বিষয়ে তিনি বলেন, ইটস নট অ্যাট অল এ রিজন। আমি যদি কোনোদিনও কূটনৈতি পাসপোর্ট নাও নেই আমার কি বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ হবে? আমি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিতে কিন্তু বাধ্যও না। ওটা একটা প্রিভিলেজ হুইচ আই ক্যান এভেইল। আমি আমার জায়গা থেকে এটা আমি নিতে পারি চাইলে। কিন্তু এটা আমাকে নিতেই হবে এমন কোনো কথা নেই এবং কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে পাসপোর্ট কারণ ছিল, পাসপোর্ট কারণ ছিল না। অন্য কারণ ছিল এগুলো ইন্ডিয়ান মিডিয়াতেও আসলে কম-বেশি এসেছে।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, আমি চাইনি ইমিগ্রেশনের সিলটা নিতে, যে আমি ওখানে প্রবেশ করিনি, এটার একটা সাইন থাকা দরকার। এ কারণে আমার কিন্তু ফেরাটা জটিল হয়েছে না হলে এটা সহজ হতে পারত। কিন্তু আমি ডিসাইড করেছি যে আমি এই সিলটা এবার নেব না।
পরবর্তী সময়ে ভারতে আবার যাবেন কি না- জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, আমি এই কথা খুব স্পষ্ট করে দিচ্ছি, আমি যদি প্রপার ইনভাইটেশন পাই আমি নিশ্চয়ই যাব। আমি ভারতের সঙ্গে এনগেইজ করতে চাই লজিক্যালি অ্যান্ড রেশনালি। কথাটা খুব ইম্পরট্যান্ট। ভারতের সঙ্গে এনগেইজ করার কথা বললে কারো কারো কাছে মনে হয় যে আমি দেশ বিকিয়ে দিতে যাচ্ছি। বাংলাদেশ বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এই সরকার কখনো করবে না, এটা সবার আগে বাংলাদেশ বলছি আমরা। সুতরাং ভারতের সঙ্গে আমরা এনগেইজ করতে চাই আমাদের সমমর্যাদার ভিত্তিতে, আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আরও অনেক কিছুতে আমাদের উন্নতি করার সুযোগ আছে।
তিনি বলেন, গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বছরের ডিসেম্বরে। আমাদের সেই পানি চুক্তি রিনিউয়াল নিয়ে কথা আছে, আমাদের তিস্তা চুক্তি নিয়ে কথা আছে। অভিন্ন আরও ৫৩টা নদী আছে। ভারতের সঙ্গে এনগেজমেন্ট আছে। সেখানে যদি কোনোভাবে রোল প্লে করতে পারি আমি, আমি সেটা লুফে নেব।
আমি এটা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেই আমার সঙ্গে যে আচরণ হয়েছে, সেই আচরণের জন্য আমি যা করেছি, এটা ওই আচরণের একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই ভারত তার এই মানসিকতা নিয়ে আমাদের সঙ্গে আসবে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, আমি এটাকে ব্যক্তিগতভাবে নেইনি। আমি দেখেছি যে একটা সরকারের একটা পজিশনের একজন মানুষের সঙ্গে এই আচরণ হচ্ছে, সেই কারণে আসলে ওটা করেছি, সেই জন্য এটা ধরে রাখা কিছু নেই।
এ ঘটনার জন্য ভারতের বাংলাদেশের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা উচিত কি না- এ বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, আমার কাছে এই জবাব নেই। আমাদের রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কী পদক্ষেপ নেব, কীভাবে নেব, এটা এখন আমাদের পররাষ্ট্রকে জিজ্ঞাসা করুন, যেহেতু ডেলিগেটটা ছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। তারা আলোচনার মাধ্যমে, তারা নিশ্চয়ই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কথা বলে ঠিক করবেন কী করবেন।