মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনার আশা ভেঙে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে হামলা-পাল্টা হামলা। সংঘাত এখন শুধু সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ নেই; হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বন্দর, সেতু, রেলপথ, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের মতো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
ইরানের অবকাঠামোতে টানা মার্কিন হামলা
গত কয়েক দিনে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক, বুশেহর, বান্দার আব্বাস ও ইরানশাহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব হামলায় সেতু, রেললাইন, বন্দর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খামির বন্দরের কাছে দুটি সেতুতে হামলায় অন্তত দুইজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। বান্দার আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় একজন নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার খবরও দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। তেহরান দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সেনাবাহিনী কাজ করছে। ফলে সংঘাতের পরিধি ধীরে ধীরে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
কেন ভেঙে গেল সমঝোতা?
কয়েক সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করা। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে সেই উদ্যোগ ভেঙে পড়ে। এরপরই আবার শুরু হয় সামরিক অভিযান।
ট্রাম্পের নতুন যুদ্ধ ঘোষণা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য এই অভিযান প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আরও হামলা চালানো হবে।
তেহরানের কঠোর হুঁশিয়ারি
এর জবাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অবকাঠামোতে হামলা বাড়ায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও ইরানের হামলা থেকে রক্ষা পাবে না। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি ইরানের ‘অলঙ্ঘনীয় লাল রেখা’ এবং সেখানে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।
ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি থেকে সরে গেলো ইরান
ইরান শুধু হরমুজ নিয়েই কঠোর অবস্থান নেয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি থেকেও সরে এসেছে। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌম অধিকার রক্ষার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
লোহিত সাগরেও কি ছড়িয়ে পড়বে যুদ্ধ?
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা চালায়, তাহলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট বন্ধের জন্য ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনকে প্রস্তুত থাকতে বলেছে তেহরান। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবু এমন সম্ভাবনাই বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
হরমুজ ও লোহিত সাগর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। অন্যদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ লোহিত সাগর। এই দুটি রুটে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
সংঘাতের প্রভাব এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দৃশ্যমান। টানা হামলা-পাল্টা হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৫ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র এক সপ্তাহেই দুই ধরনের তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।
শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু তেল বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়ার কয়েকটি শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক একদিনেই ৩ শতাংশের বেশি নেমে গেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট যদি দ্রুত কূটনৈতিকভাবে সমাধান না হয়, তাহলে এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, উৎপাদন খরচ বাড়বে, মূল্যস্ফীতি নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে।
বিশ্ব এরই মধ্যে একাধিক অর্থনৈতিক ধাক্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স-আল জাজিরা, সিএনএন