হাতে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়। তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে পিটেয়ে মেরেছে তার সিনিয়র বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে তার সখ্য ছিল। চলাফেরা, ওঠাবসা ছিল।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
অপ্রতিম হত্যায় আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ সুপার জানান, অপ্রতিমকে কৌশলে হত্যা সংঘটিত হওয়ার স্থানে নেওয়া হয়। পরে তার মাথায় বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। পিটিয়ে ফেলে রাখা হয়। সেখানেই অপ্রতিমের মৃত্যু হয়।
এই শিশুকে হত্যায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো কামরুল হাসান। তারা হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছেন। এছাড়া সিয়াম নামে একজন আটক আছেন, যার বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে।
অপ্রতিম নিখোঁজের জিডির পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রথমে তুহিনকে আটক করা হয়। এই তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরিসহ নানান অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, তুহিনই অপ্রিতমকে বাসা থেকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে নিয়ে যায়। তার কাছ থেকেই ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ।
তিনি বলেন, ‘শুক্রবার বিকেল ৫টা-৬টার দিকে ওই জঙ্গলে আইফোন ছিনিয়ে নিতে গেলে অপ্রতিম তাদের বাধা দেয়। এতে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এরপর প্রথমে তুহিন, পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে তারা পালিয়ে যায়।’
জেলার পুলিশপ্রধান বলেন, জিডির ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করা হয়। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলে নিয়ে যায়। এর ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়। পরে নিখোঁজ অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন স্বীকার করে, আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ফাহাদ। পরে ফাহাদকে আটক করা হলে জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ জানায়, কামরুলও জড়িত ছিল।
মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘হত্যার দিন শুক্রবার রাতে বাসাতেই ঘুমিয়েছিলেন তুহিন। তার বাসার খাটের তোশকের নীচ থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। তাকে আটক অবস্থায় তার দেখানো মতে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।’
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সমস্ত আলামত পাওয়া গেছে। এখন আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান বলে জানান পুলিশ সুপার।
অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শালবন বিহারে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় সে। সন্ধ্যার পরও বাসায় না ফেরায়, তার মা কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পর থেকে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল স্বাভাবিক থাকেন। শনিবার সকাল ৮টার দিকে তারা তিনজনই অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে ক্রন্দনরত তার মা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা নাহিদকে সান্ত্বনা দেন। সেখান থেকে ফিরে তারা যে যার মতো চলে যান। তুহিন সানন্দায় নিজের বাসায় গিয়ে স্বাভাবিক সময় কাটান।
সেদিন দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা তুহিনকে সানন্দায় নিজ বাসা থেকে আটক করেন। পরে তার মোবাইলে অপ্রতিমের সঙ্গে চ্যাটিং এবং তাকে ডেকে আনার প্রমাণ পায়।
এদিকে রোববার দ্বিতীয় জানাজা শেষে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি গোরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়। এর আগে গন্ধমতি স্কুল মাঠে দ্বিতীয় এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা অংশ নেন। ছিলেন পরিবারের সদস্য ও স্বজনরাও।