কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসে জ্বলে ওঠা আগুন চার দিনেও নেভেনি। বরং সময়ের সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি উদ্বেগও বাড়ছে। কেউ কেউ ঘটনাস্থলে প্রাকৃতিক গ্যাস বা মূল্যবান খনিজ সম্পদের মজুত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। তবে গ্যাসের প্রকৃতি ও ভূগর্ভে এর মজুত সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) জানিয়েছে, ভূগর্ভের সংশ্লিষ্ট স্তরে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে পারে। জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে গ্যাস অন্য পথে বেরিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে। ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ থেকে ২৫০ বর্গমিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ খননের সময় আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে। সময়ের সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাপেক্স, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা দূর থেকে আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে ভিড় করা লোকজনকে সরিয়ে দিচ্ছেন। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাসে আগুনের শিখা দুলছিল। আগুন দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার বিকেল ৫টার পর আগুনের তীব্রতা বাড়তে শুরু করে। শুরুতে বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের সহযোগিতা করেন। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হওয়ায় এবং পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় পরে সেই চেষ্টা বন্ধ রাখা হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বৃহস্পতিবার বলেন, আগুনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। বাপেক্স ও ফায়ার সার্ভিসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূগর্ভের গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে। গ্যাস অন্য কোনো পথে বেরিয়ে গেলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুর আরহাম বলেন, নলকূপ দিয়ে বেরিয়ে আসা গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে পারে। ভূগর্ভের সংশ্লিষ্ট স্তরে গ্যাসের মজুত শেষ হলে আগুন নিভে যাবে। জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে গ্যাস অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গ্যাসের মজুত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেওয়ার পরামর্শ বাপেক্সের, বিদ্যুৎবিহীন ৮-৯ হাজার গ্রাহক
তিনি আরও বলেন, ঝুঁকি এড়াতে আগুনের আশপাশের ২০০ থেকে ২৫০ বর্গমিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখতে বলা হয়েছে। সেখানে লোকজনের বসবাস ও জনসমাগম করা যাবে না। আগুন নিভে যাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় আগুন অন্তত এক সপ্তাহ জ্বলতে পারে। আগুনের তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস বের হওয়ার নলকূপের মুখও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত এবং বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয়দের কৌতূহল
আগুনকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ঘটনাস্থলে প্রাকৃতিক গ্যাস বা অন্য কোনো খনিজ সম্পদের উপস্থিতি থাকতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘হয়তো এবার বাংলাদেশ গ্যাস বা খনিজ সম্পদ পেতে যাচ্ছে। এমন কিছু পাওয়া গেলে দেশের গ্যাসসংকট অনেকটা কমতে পারে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আমির হামজা বলেন, ‘এই চার দিনে অন্তত কোটি টাকার গ্যাস উড়ে গেছে। এই গ্যাস প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজে লাগানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলত।’
তবে ঘটনাস্থলে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুত বা অন্য কোনো মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন জরুরি।
বিদ্যুৎবিহীন ৮-৯ হাজার গ্রাহক
আগুনের কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় মেরিন ড্রাইভের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ৪৫টির বেশি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। পাশাপাশি মেরিন ড্রাইভ থেকে ইনানী ও কোটবাজারে যাতায়াতের সড়কে যান চলাচলও সীমিত রাখা হয়েছে।
উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) কায়সার নূর বলেন, আগুন বৈদ্যুতিক খুঁটির তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উখিয়া স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীর ছোট ব্রিজসংলগ্ন একটি বসতভিটায় গভীর নলকূপ খননের সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে সফল না হওয়ায় মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে সেই তৎপরতা বন্ধ রাখা হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাপেক্সের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভূগর্ভের গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।