খণ্ড খণ্ড দৃশ্যের মিলনে এক রাতে তৈরি হয়েছে দুই ইতিহাস। যে ইতিহাসের নির্মাতা ইকুয়েডর আর শিকার জার্মানি। জার্মানির সঙ্গে শক্তি–সামর্থ্যের পার্থক্যে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা ইকুয়েডরকে এই বিশ্বকাপে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখেছিল অনেকে। কিন্তু প্রথম দুই ম্যাচে ভালো খেলেও প্রাপ্তি ছিল মাত্র ১ পয়েন্ট। গোল ছিল না।
অন্যদিকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠেছে আইভরিকোস্ট। নিকোলাস পেপের জোড়া গোলে কুরাসাওকে হারিয়ে (২–০) শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে জায়গা নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দলটি। নকআউটে উঠতে আইভরি কোস্টের প্রয়োজন ছিল মাত্র ১ পয়েন্ট। এর আগে বিশ্বকাপে তিনবার অংশ নিয়ে প্রতিবারই তাদের বিদায় নিতে হয় গ্রুপ পর্ব থেকে।
কুরাসাওয়ের রক্ষণভাগের ভুলে বল কেড়ে নেন ইয়ান দিয়োমান্দে। এরপর তার বাড়ানো বল সহজেই জালে পাঠান পেপে। ৬৫তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন সাবেক আর্সেনাল ফরোয়ার্ড পেপে। বাম পায়ের নিখুঁত শটে কুরাসাও গোলরক্ষক এলয় রমকে ফাঁকি দিয়ে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণে। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম তারা এক আসরে দুটি ম্যাচ জিতল।
এদিকে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার ‘ই’ গ্রুপের শেষ রাউন্ডে ২-১ গোলে জিতেছে ইকুয়েডর।
জার্মানির নকআউটের টিকেট নিশ্চিত হয়েছিল আগেই। তিন ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা চারবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা। তাদের সমান পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে পরের ধাপে উঠেছে আইভরি কোস্ট।
৪ পয়েন্ট নিয়ে তিনে আছে ইকুয়েডর। সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দলের একটি হিসেবে নকআউটে যাওয়া নিশ্চিত করেছে তারা। ১ পয়েন্ট পাওয়া কুরাসাও বিদায় নিয়েছে।
৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে ১২টি গ্রুপের প্রথম দুটি দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দল নিয়ে হবে নকআউটের প্রথম ধাপ- রাউন্ড অব ৩২।
লক্ষ্য পূরণে এই ম্যাচে ইকুয়েডরের জয়ের বিকল্প ছিল না। উজ্জীবিত পারফরম্যান্সে সেটিই করে দেখাল তারা। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের নকআউটে খেলবে ইকুয়েডর। জার্মানির বিপক্ষে তিনবারের দেখায় ইকুয়েডরের প্রথম জয় এটি।
লিহয় জানের গোলে পিছিয়ে পড়ার একটু পরই দলকে সমতায় ফেরান নিলসন অ্যাঙ্গুলো। দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান গড়ে দেন প্লাটা।
বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ইকুয়েডরের জন্য ম্যাচের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। দ্বিতীয় মিনিটেই এগিয়ে যায় জার্মানি। ফ্লোহিয়ান ভিয়েৎসের নিখুঁত পাস বক্সে পেয়ে বাম পায়ের শটে বল জালে পাঠান লিহয় জানে।
বিল্ডআপের শুরুতে বল ক্লিয়ারের চেষ্টা করা ইকুয়েডরের পেদ্রোর মাথার ওপরে পা তুলেছিলেন জার্মানির আলেকসান্দার পাভলোভিচ। আঘাত পেয়ে পড়ে যান পেদ্রো। গোলের পর প্রতিবাদ জানায় ইকুয়েডরের খেলোয়াড়রা। তবে ভিএআরের সাহায্যে গোল বহাল রাখেন মার্কিন নারী রেফারি টরি পেনসো।
জবাব দিতে অবশ্য বেশি সময় নেয়নি ইকুয়েডর। নবম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শটে সমতা টানেন নিলসন অ্যাঙ্গুলো।
এবারের বিশ্বকাপে ইকুয়েডরের প্রথম গোল এটি! প্রথমার্ধে আর উল্লেখযোগ্য সুযোগ কেউ তৈরি করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কাই হাভার্টজ বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। তবে পরে ভিএআরের সাহায্যে মনিটরে দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টান তিনি। বিল্ডআপের সময় পেদ্রোকে ফাউল করেছিলেন জানে।
৬২তম মিনিটে এগিয়ে যেতে পারত ইকুয়েডর। জন ইয়েবোয়ার পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ২০ গজ দূর থেকে জোরাল শট নেন এনার ভ্যালেন্সিয়া। ঝাঁপিয়ে ফিরিয়ে দেন জার্মানির ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ী গোলরক্ষক মানুয়েল নয়ার।
আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে দুই পাশে। সুযোগও মিলতে থাকে। কিন্তু গোলের দেখা আর মিলছিল না। ৭৭তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্ত। ইকুয়েডরের কর্নারে বক্সে হেড করেন কেভিন রদ্রিগেজ। গোলরক্ষক নয়ারের সামনে থেকে বুটের টোকায় বল জালে পাঠিয়ে উল্লাসে মাতেন প্লাটা।
শেষ বাঁশি বাজার পর সেই উদযাপনের মাত্রা বেড়ে যায় আরও।
টানা ১৯ ম্যাচ অপরাজিত থেকে এই বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ইকুয়েডর। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাই পর্বে তারা ছিল দ্বিতীয় স্থানে।